চীন কি করে প্রযুক্তির রাজা হলো? জানুন রহস্য!


চীন দেশ নিয়ে আপনি কতোটা গভীর হয়ে ভাবেন? অবশ্য এটা ভাববারই কথা। এতোটা কম দামে এতোটা নামি দামি প্রোডাক্ট চিন কিভাবে দিতে পারে? এটা শুধুমাত্র আপনার বা আমার প্রশ্ন নয়। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের জনগন, সরকার, প্রশাসন, সকল লোকজনের মাথায় এই একই বড়ো একটি প্রশ্ন রয়েছে।

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়ত চায়নার নিজেদের জনগন দেরও জানা নেই। সঠিক উত্তরটা হয়তো দেশের সরকার মহলের লোকেরাই বলতে পারে। এবং আপনি আমি সহ অন্যান্য সকল দেশের সরকার ও জনগণরা যেমনটা ধারণা করে সেগুলো কিছুটা আংশিক উত্তর মাত্র। এবং আজকেও আমি এই সব গুলো প্রশ্নের যেই উত্তর গুলো দিবো সেগুলোও এক একটি আংশিক উত্তর হবে। সঠিক উত্তর দেওয়া আপনার আমার কারোই পক্ষে সম্ভব নয়।

চায়নার বর্তমান অবস্থা

প্রথমে চায়নার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক। এরপর ইতিহাস এর দিকে যাচ্ছি। পৃথিবীর সবচাইতে রহস্যময় দেশগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে চায়না। কি নেই এই দেশে? কি পারেনা এই দেশের লোকেরা?

চায়না হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেই দেশ নিজেদের উন্নয়ন এর সাথে সাথে সারা পৃথিবীর ৯০ শতাংশ দেশের উন্নয়নে খুবই বড়সড় ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র প্রযুক্তির দিক দিয়েই নয়। একটা সামান্য ব্লেড, সামান্য একটি সুতাও চায়না আমাদেরকে খুবই কম দামে প্রোভাইড করতে পারে। এমনকি যেই জিনিসটা আমরা বাঙালিরাই স্বাভাবিক দাম নিয়ে তৈরি করতে পারি চায়না সেটারও অস্বাভাবিক ভাবে দাম কমিয়ে আমাদের দেশে ইমপোর্ট করে দেয়। ফলে আমরা আরো কম দামে সকল রকমের প্রোডাক্ট পেয়ে আমদের জীবনযাত্রার মান আরও বেশি সহজ ও উন্নয়ন করতে পারি।

তারা সামান্য করোনা ভাইরাস দিয়েই পুরো পৃথিবীকে থামিয়ে দিতে পারলো। অথচ পৃথিবীর সবগুলো দেশ মিলেও চায়নার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পারলো না। এটা কী পুরো পৃথিবীকে চায়নার কাছে হেরে যাওয়া কিংবা তাদের ব্যর্থতা নয়? পৃথিবীর বড়ো ছোটো প্রত্যেকটি প্রজেক্ট এ এমন কি আমাদের পদ্মাসেতু প্রকল্পেও রয়েছে চাইনিজ দের খুবই বড় সরো ভূমিকা। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক চিন দেশের প্রযুক্তির উন্নয়নের ইতিহাস।

চায়নার প্রযুক্তির উন্নয়নের ইতিহাস

১৯৭৯ সালের আগে চিন আমাদের দেশের মতোই একটি গরীব দেশ ছিল। তাদের এই প্রযুক্তিগত এবং অন্য সকল দিক দিয়ে এতো দ্রুত উন্নয়নের পরিকল্পনা করার জন্য চীনকে টানা ১২ বছর যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তৎকালীন চাইনিজ সরকারের মাথায় তখন খুব জটিল একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।

সেই প্রশ্নটা কিছুটা এমন ছিল যে, এতগুলো ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া করে কি করবে? লেখাপড়া শেষ করে কর্মসংস্থান করবে কী করে? চায়নায় তখনও তাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কর্মসংস্থান এর অভাব ছিল। চায়না তখনই দেশের সকল ইউনিভার্সিটি গুলোর ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দিল এবং তখনকার সকল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান অথবা আন্তকর্মসংস্থান গড়ে তোলার জন্য চায়না তাদের শিক্ষার্থীদের যেকোনো বিষয়ের উপর হাতে কলমে কাজ শিখাতে শুরু করলো। যেন সকল শিক্ষার্থী নিজের থেকে যেকোনো একটি কাজে দক্ষ হয়ে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান খুঁজে বের করে অথবা আন্তকর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। এই উদ্যেগে তৎকালীন চায়নায় সরকার, জনগন, প্রশাসন, সকলে মিলে খুবই কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদেরকে খুবই দক্ষ একটি জনবলে পরিণত করলো।

এতে করে তখন চায়নার ছাত্র সমাজ, যুব সমাজ এর কর্মসংস্থান খুঁজে বের করার কোনো প্রয়োজনই হলো না। তখনই প্রতিটি ঘরের লোকজনই তাদের ঘরে বসে হাতে কলমে কিছু একটা প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরী করতে লাগলো এবং বাজারে বিক্রি করতে লাগলো। এতে করে তখন বাজারে পণ্যের পরিমাণ খুবই বেড়ে গেলো। পণ্যের চাহিদা অনেকটা কমে গেল। ফলে পণ্যের দাম কমতে শুরু করলে।

তবে চায়না হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ। এজন্য এই দেশের শ্রমিকরা কম মজুরি নিয়েও কাজ করে। ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচও অনেকটা কম হয়। তাই তাদের দেশে পণ্যের দাম কমে গেলেও তাদের তেমন একটা লোকসান হয় না।

তবে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের সরকার পণ্যগুলো বিদেশে রপ্তানী করা শুরু করলো। এতে করে বিদেশিরা কম দামে প্রোডাক্ট পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সমস্যা ছিল যে চায়নার ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেগুলো শুধুমাত্র চাইনিজরাই ব্যবহার করে সেগুলো আর আমাদের দেশে সহ অন্য কোনো দেশে বিক্রি হচ্ছিলো না। তখন তারা অনেক বড় একটা চাল চাললো। প্রত্যেকটি দেশের মানুষের সম্পূর্ন চাহিদা সম্পর্কে জানতে লাগলো এবং পৃথিবীর সকল দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের সব রকমের চাহিদা অনুযায়ী সমস্ত প্রোডাক্ট কম খরচে বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

এই চেষ্টায় তারা সফল ও হয়। আজকাল হিন্দুদের মূর্তি, মুসলিমদের টুপি পাঞ্জাবিও চায়না থেকে ইমপোর্ট করা হয়। অর্থাৎ চায়না এমন সব জিনিস বানিয়ে আমাদের এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ইমপোর্ট করছে যেগুলো তাদের কোনো প্রয়োজনেই পড়ে না। তাড়া সম্পূর্ণরূপে বিদেশিদের জন্যে প্রোডাক্ট বানাচ্ছে এবং বিদেশিদের কাছে বিক্রি করছে। এভাবেই ধীরে ধীরে চীন প্রযুক্তি সহ সকল দিক দিয়ে অন্য সব দেশ গুলোকে পিছে ফেলে দিয়েছে।

চায়নার কপি প্রোডাক্ট

অনেকের মতে আবার চায়না তাদের দেশের মিলিটারি বাজেট থেকে কিছু অংশ প্রযুক্তির উপর রিসার্চ করার জন্য ব্যবহার করে। তাছাড়া প্রযুক্তির দিক দিয়ে চায়না নকল প্রোডাক্ট তৈরী করতে সবচাইতে এগিয়ে। চায়না খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই সারা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে রিলিজ হওয়া যেকোনো আইটি প্রোডাক্ট এর হুবহু কপি বানিয়ে ফেলতে পারে। আপনার আমার পক্ষে সেই কপি প্রোডাক্ট কে ডিটেক্ট করা একেবারেই অসম্ভব।

সেই কপি প্রোডাক্ট গুলোর দাম খুব কম হলেও সেই কপি প্রোডাক্ট গুলো বেশীদিন টেকসই হয় না। কোয়ালিটি খুবই খারাপ হয়।
তাছাড়া চায়নায় যেমন একদিকে ওয়ার্কারদের বেতনও কম তেমনি প্লেসও অনেক বেশি থাকে। এজন্য যেকোনো দেশের কোম্পানী চায়নাতে ফ্যাক্টরি খুলে প্রোডাক্ট তৈরী করা শুরু করে।

চায়নার রাজনৈতিক পরিবেশ

এছাড়া চায়নার সরকার তাদের দেশের যেকোনো কারিগরি সেক্টরে যথেষ্ট পরিমাণ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের দেশের পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক। দেশে যত বড়ই দুর্ঘটনা ঘটুক। রাজনৈতিক ব্যাপারটি যতই খারাপ হোক। চীন সবসময় তাদের দেশের কারিগরি সেক্টর যেনো ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেই দিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। দেশে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো নিয়ম কানুন পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশের ব্যবসায়ী এবং জনগণরা। এজন্য আমাদের দেশে একটি বড়সড় কোনো কোম্পানী খোলা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে চায়নাতে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এবং দেশের কারিগরি অবস্থা ভালো থাকায় তাছাড়া দেশের শ্রমিকদের বেতন কম হওয়ায় পৃথিবীর সকল প্রযুক্তি নির্ভর কোম্পানী চায়নায় ফ্যাক্টরী বানিয়ে থাকে। পৃথিবীর যেকোনো কোম্পানী যেই দেশেই প্রথম তৈরি হোক না কেন, চায়নাতে তার একটি বড়োসড়ো ফ্যাক্টরী থাকবেই। এভাবে যেমন কোম্পানীগুলোও ভালো সুবিধা পাচ্ছে। তেমনি চায়নার শ্রমিকরাও কর্মসংস্থান এর সন্ধান পাচ্ছে।

চায়নার উদ্যোক্তা কোম্পানী

তাছাড়া চীন দেশের অনেক অনেক কোম্পানী আছে। যেগুলোর মালিক প্রথমে কোনো আমেরিকান কোম্পানীতে কাজ করত। পরবর্তীতে তারা তাদের নিজের দেশ চায়নাতে এসে নিজের ফ্যাক্টরী খুলে কম দামের মধ্যে এমন সব প্রোডাক্ট বানিয়ে দিচ্ছে যেগুলো তার আগের কোম্পানীর থেকে দুই, তিন গুণ বেশি সুবিধা দিচ্ছে। এমন উদাহরন আমাদের পৃথিবীতে অনেক আছে।

চায়নার নাগরিকরা যা ব্যবহার করে

আপনি কি ভাবেন চায়নার নাগরিকরা শুধুমাত্র চাইনিজ প্রোডাক্ট ব্যবহার করে? কখনই না, চায়নার নাগরিকরা কখনই আইফোন কিংবা কোনো চাইনিজ প্রোডাক্ট ব্যবহার করে না। চায়না যেই সব প্রোডাক্ট ব্যবহার করে সেগুলো তারা জার্মান, ইতালি অর্থাৎ ইউরোপীয় দেশ গুলোর থেকে আমদানি করে। আর নিজেরা যেসকল প্রোডাক্ট বানায় সেগুলো আমাদের দেশে সহ পৃথিবীর সকল ছোটো বড় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে থাকে। তো আমি কিছু কথা সহ আজকের পোষ্টটি শেষ করে দিচ্ছি।

শেষকথা
চায়না আসলে খুব ভালোমত বুঝতে পেরেছিল যে তারা আসলে কোন দিকটি নিয়ে কাজ করলে বা কোন দিকে বেশী গুরুত্ব দিলে তাদের দেশের উন্নয়ন এর গতি বৃদ্ধি পাবে। চায়না একদম সঠিক জায়গামত টাকা পয়সা খরচ এবং পরিশ্রম দিতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আজ পৃথিবীর সকল দেশই প্রায় চায়নার উপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। চায়না তাদের ছাত্রছাত্রীদের কারিগরি শিক্ষা, এবং প্রযুক্তির উপর একদম সঠিকভাবে টাকা খরচ করতে সক্ষম হয়েছে। চীনের সরকার যেকোনো দিক দিয়ে খুবই কঠোর এবং দেশের নাগরিকরা কখনই কোনো বিষয়ের উপর আন্দোলনের সুযোগ পায় না।

কারণ তাদের দেশের নাগরিকরা তাদের নিজেদের কাজে খুবই ব্যস্ত থাকে। চায়নাতে কেউ ঘরে বসে থাকতে পারে না। কেউ ঘরে বসে থাকলে কিছুদিন পরই সে নিজের ঘরকে নিজের ফ্যাক্টরিতে পরিণত করে ফেলে। এজন্য কোনো লোক নিজেকে বেকার দাবি করতে পারে না। আজকের টিউন তবে এখানেই রাখি, ধন্যবাদ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *